আমরা যে বিশাল পৃথিবীর বুকে চড়ে বেড়াই, তার উপরিভাগ বা ভূত্বক কিন্তু সব জায়গায় সমান নয়। কোথাও নদী, কোথাও পাহাড়, কোথাও আবার মানুষের তৈরি বিশাল সব ইমারত। জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রতিনিয়তই আমাদের এই ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন বিন্দু, রেখা, স্থাপনা বা নির্দিষ্ট এলাকার নিখুঁত অবস্থান জানার প্রয়োজন হয়। আর এই জানার কাজটি সহজ করে দেয় একটা নকশা বা ম্যাপ (Map)।
আজকের এই রকেটের গতিতে এগিয়ে যাওয়া প্রযুক্তির যুগে ম্যাপের গুরুত্ব কেবল জমির সীমানা মাপার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা খনিজ সম্পদ আহরণ, নভোমণ্ডলে মহাজাগতিক বস্তুর গতিবিধি ট্র্যাক করা, দেশের সামরিক নিরাপত্তা রক্ষা, সমুদ্রের গভীরতা ও জলভাগের তথ্য সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে বড় বড় মেগা প্রজেক্টের (যেমন: পদ্মাসেতু বা মেট্রোরেল) ডিজাইন তৈরি করা—সবখানেই আগে প্রয়োজন একটি নিখুঁত মানচিত্র।
তাহলে যদি প্রশ্ন করা হয়, জরিপ বা সার্ভেয়িং (Surveying) আসলে কী?
খুব সহজ ভাষায়: যে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া ও ব্যবহারিক কলাকৌশলের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠের ওপরে, নিচে কিংবা মহাশূন্যে অবস্থিত বিভিন্ন বস্তু বা বিন্দুর পারস্পরিক আপেক্ষিক অবস্থান (Relative Position) নির্ণয় করে একটি নিখুঁত নকশা বা ম্যাপ তৈরি করা হয়, তাকেই জরিপ বলে।
Table of Contents
জরিপ এর ব্যাখ্যা
জরিপের বিশাল ভুবন: এটি বিজ্ঞান নাকি কলা?
জরিপ শব্দটা শুনলেই আমাদের চোখে শুধু ফিতা হাতে আমিন বা সার্ভেয়ারদের ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু জরিপের ধারণা আসলে আকাশচুম্বী ব্যাপক। ক্ষেত্রবিশেষে এর পরিধিকে প্রধানত তিনটি ভাগে দেখা যায়:
- স্থলভাগ: এখানে রয়েছে সাধারণ ভূমি জরিপ, খনিজ সম্পদ খোঁজার জরিপ, সামরিক কৌশলগত জরিপ এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্টের প্রকৌশল জরিপ।
- জলভাগ: সমুদ্র, নদী ও পানির উৎস সংক্রান্ত তথ্য ও নেভিগেশনের জন্য মেরিন বা হাইড্রোওগ্রাফিক জরিপ।
- নভোমণ্ডল: মহাশূন্যের গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান জানতে জ্যোতিঃশাস্ত্রীয় (Astronomical) জরিপ।
জরিপ যেমন আমাদের কোনো জায়গার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, দূরত্ব, পরিসীমা বা ক্ষেত্রফল নিখুঁতভাবে জানিয়ে দেয়, তেমনি ক্ষেত্র অনুযায়ী পরিমাপের সঠিক পদ্ধতি, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও তার ক্যালিব্রেশন, নকশা অঙ্কনের জটিল টেকনিক এবং ম্যাপে বিভিন্ন প্রতীকের (Conventional Signs) ব্যবহার সম্পর্কেও স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, জরিপ আসলে কী—বিজ্ঞান নাকি কলা (Art)? বাস্তবতা হলো, জরিপ কাজ করতে গেলে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, কোণ কিংবা গড় সমুদ্রতল (M.S.L = Mean Sea Level) মাপার জন্য আমাদের ভারী বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হয় এবং গণিত ও বিজ্ঞানের জটিল সব সূত্র ও তত্ত্ব প্রয়োগ করতে হয়। এই দিক থেকে বিচার করলে জরিপ অবশ্যই একটি নিখুঁত বিজ্ঞান (Science)।
আবার অন্যদিক থেকে, মাঠে দাঁড়িয়ে কড়া রোদে বা বৈরী আবহাওয়ায় নিখুঁতভাবে রিডিং নেওয়া, প্রতিকূল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে উপাত্ত সংগ্রহ করা এবং ডেস্কে বসে চমৎকারভাবে নকশা ফুটিয়ে তোলার জন্য একজন মানুষের ব্যক্তিগত চমৎকার ব্যবহারিক দক্ষতা ও নান্দনিকতাবোধের প্রয়োজন হয়। তাই বলা যায়, জরিপ মূলত ব্যবহারিক দক্ষতা বা Art এবং বিশুদ্ধ Science-এর এক অনবদ্য জুটি বা সমন্বিত রূপ।

সমতলমিতি বা লেভেলিং (Levelling)
ভূপৃষ্ঠের সব বস্তু বা বিন্দু কখনো একই সমতলে বা উচ্চতায় অবস্থান করে না। তাই কাগজের ফ্ল্যাট পাতায় কোনো কিছুর অবস্থান দেখাতে গেলে শুধু ডানে-বামে বা অনুভূমিক তলের (Horizontal Plane) ওপর নির্ভর করলে চলে না। বস্তুটা কতটা উঁচুতে বা কতটা নিচুতে আছে, অর্থাৎ উল্লম্ব তলে (Vertical Plane) তার অবস্থান দেখানোরও প্রয়োজন পড়ে। আর জরিপ বিজ্ঞানের যে বিশেষ শাখাটি এই উঁচু-নিচুর হিসাব বা সমতলমিতি নিয়ে কাজ করে, তাকেই বলা হয় লেভেলিং (Levelling)।

জরিপ কাজের ৪টি স্বর্ণালী নীতি (Golden Principles of Surveying)
যুগে যুগে প্রখ্যাত জরিপকারীরা মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে এক চরম সত্য উপলব্ধি করেছেন—সামান্য একটু ভুলের কারণে পুরো ম্যাপ বা প্রজেক্ট বাতিল হয়ে যেতে পারে। তাই তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকেই ৪টি মূল নীতি তৈরি হয়েছে, যা পৃথিবীর সব সার্ভেয়ারকে মেনে চলতে হয়:
ক) ‘সমগ্র হতে অংশের দিকে’ কাজ করা (Always work from whole to part): জরিপ করার সময় প্রথমে পুরো এলাকার প্রধান ফ্রেমওয়ার্ক বা বড় বড় কন্ট্রোল স্টেশনগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আগে স্থাপন করতে হয় (Whole)। এরপর সেই বড় কাঠামোর ভেতরে ঢুকে ছোট ছোট অংশের ডিটেইলিং করতে হয় (Part)। এর সুবিধা হলো, ছোটখাটো কোনো ভুল হলে তা ওই নির্দিষ্ট অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, পুরো ম্যাপে ছড়িয়ে পড়ে না।
খ) উদ্দেশ্যের সাথে মিল রেখে সঠিক পদ্ধতি বেছে নেওয়া: আপনি আসলে কী কাজের জন্য জরিপ করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে পদ্ধতি ও যন্ত্রপাতি নির্বাচন করতে হবে। একটি সাধারণ ক্যাডাস্ট্রাল বা জমির সীমানা জরিপের জন্য যে ফিতা-কম্পাস চলে, একটি মেট্রোরেলের প্রজেক্টে তার চেয়ে হাজার গুণ আধুনিক টোটাল স্টেশন বা জিপিএস প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
গ) পর্যাপ্ত নিরীক্ষা বা চেকের ব্যবস্থা রাখা (Provisions of adequate checks): মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। তাই জরিপের প্রতিটা পরিমাপের সাথে সাথে এমন কিছু স্বাধীন চেক লাইন বা ট্রায়াঙ্গুলেশন রাখতে হবে, যাতে মাঠেই সাথে সাথে ধরা পড়ে যে রিডিংটা সঠিক হয়েছে নাকি ভুল।
ঘ) তথ্য লিপিবন্ধকরণে চরম সততা ও সতর্কতা: মাঠে পাওয়া তথ্য বা ডাটাগুলো ফিল্ড বুকে লেখার সময় কোনো রকম অনুমানের আশ্রয় নেওয়া যাবে না। যা পাওয়া গেছে, ঠিক ততটুকুই অত্যন্ত নিখুঁত ও সতর্কতার সাথে লিপিবদ্ধ করতে হবে। কারণ ফিল্ড বুকের সামান্য একটি ভুল সংখ্যা পরবর্তীতে ল্যাবে বা অফিসে গিয়ে মস্ত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

জরিপ হলো এমন এক চোখ, যা দিয়ে আমরা পৃথিবীর স্থানাঙ্ক আর জ্যামিতিক বাস্তবতাকে দেখতে পাই। এই বিজ্ঞানের হাত ধরেই তৈরি হয় সভ্যতার মানচিত্র।
